অনেকের দিন শুরু হয় এক কাপ কফি দিয়ে, আবার কেউ নতুনভাবে শুরু করছেন আরেকটি সহজ অভ্যাস দিয়ে—সকালে গরম পানি পান।
২১ বছর বয়সী মারিয়াম খান বলেন, “প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি দেখি। এরপর একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে মনে হলো, নিজেই একবার চেষ্টা করে দেখি না কেন।”
এটি কোনো কঠিন ব্যায়াম নয়, আবার দামী স্কিন কেয়ারের অংশও নয়। বরং একেবারেই সহজ একটি অভ্যাস—দিনের শুরুতে উষ্ণ পানি পান। বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী এই অভ্যাস অনুসরণ করছেন।
প্রাচীন চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি ও আয়ুর্বেদে বহু আগে থেকেই গরম পানি পান করার কথা বলা হয়েছে। এসব পদ্ধতিতে মনে করা হয়, শরীরের ভেতরে শক্তির প্রবাহ ঠিক রাখতে উষ্ণ খাবার ও পানীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন প্রজন্মের কাছেও এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকে দিন শুরু করছেন গরম পানি, হালকা ব্যায়াম এবং উষ্ণ নাশতা দিয়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অভ্যাস সত্যিই কি শরীরের জন্য উপকারী?
ঐতিহ্যগত ধারণা অনুযায়ী, মানুষের শরীরে এক ধরনের শক্তি প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহ ঠিক থাকলে শরীর সুস্থ থাকে, আর এতে বাধা সৃষ্টি হলে অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।
গরম পানি পান করলে এই শক্তির প্রবাহ বজায় থাকে—এমনটাই বিশ্বাস করেন অনেকেই।

একজন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা গবেষক ব্যাখ্যা করেন, শরীরকে একটি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়। ঠান্ডা খাবার সেই বাড়িতে ঠান্ডা বাতাস ঢোকার মতো, আর উষ্ণ খাবার শরীরকে ভারসাম্যে রাখতে সাহায্য করে।
এই ধারণা থেকেই অনেক অভ্যাস এসেছে, যেমন সকালে গরম নাশতা খাওয়া বা শরীর গরম রাখা।
মারিয়াম জানান, তিনি ধীরে ধীরে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়েছেন। কফির বদলে গরম পানি খাওয়া শুরু করার পর তিনি নিজেকে বেশি স্বস্তিদায়ক অনুভব করেন।
তিনি বলেন, “আগে কফি খেলে কখনও কখনও অস্বস্তি হতো। এখন গরম পানি খেলে নিজেকে অনেক হালকা লাগে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে ঐতিহ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যচর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ।
অনেকেই আধুনিক চিকিৎসার বাইরে বিকল্প কিছু খুঁজছেন, আবার কারও কাছে সহজ ও কম খরচের সমাধান হিসেবে এসব অভ্যাস আকর্ষণীয়।
এছাড়া এই ধরনের অভ্যাসে দেহ, মন এবং পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্যের কথা বলা হয়, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম পানি পান কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এটি হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এছাড়া গরম পানি গলার কিছু সমস্যা বা অস্বস্তি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এটি নিয়ে অতিরঞ্জিত কিছু দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যেমন—গরম পানি পান করলে দ্রুত ওজন কমে, শরীর ডিটক্স হয় বা মেটাবলিজম অনেক বেড়ে যায়—এ ধরনের দাবিগুলো প্রমাণিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠান্ডা পানি ক্ষতিকর—এমন কোনো তথ্যও নেই। আসল বিষয় হলো শরীরকে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে হাইড্রেট রাখা।
গরম পানি পান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মানসিক প্রভাব। এটি অনেকের জন্য একটি দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করে, যা ব্যস্ত জীবনে কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখার সুযোগ দেয়।
মারিয়াম বলেন, “আমি এটাকে শুধু পানি পান হিসেবে দেখি না। এটা আমার জন্য একটু ধীরে চলার, নিজের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময়।”
গরম পানি পান করা ক্ষতিকর নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে উপকারও দিতে পারে। তবে এটিকে কোনো অলৌকিক সমাধান ভাবা ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলা। আর নতুন কোনো স্বাস্থ্যচর্চা শুরু করার আগে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
প্রতি / এডি / শাআ